You are here
Home > Don't Miss > শ্লোক বা উক্তি > চাণক্য নীতি: জীবন পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি

চাণক্য নীতি: জীবন পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি

চাণক্য নীতি

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক চর্চার ,কূটনৈতিক চর্চা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে নামটি আজও বর্তমান প্রজন্মের কাছে জ্ঞানের আঁতুরঘর হিসাবে চিহ্নিত তা হল কৌটিল‍্যের “অর্থশাস্ত্র” নামক বইটি। হ‍্যাঁ কৌটিল‍্য যিনি চাণক্য নামেও পরিচিত। এই চাণক্য নীতি প্রাচীনযুগে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-এর সময় কালে তৈরি। চাণক্য ছিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর ছেলে বিন্দুসারের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান স্তম্ভ। চাণক্য নীতি প্রথম দেখায় কীভাবে রাজনীতি ও কূটনীতি পরিপূরক হয়ে জীবনের সেরা দর্শন রূপে সফল ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায়। চাণক্য তাঁর নীতি কথা দ্বারা ভারতে প্রথম কূটনৈতিক ধারণার জন্ম দেন। আজ আম‍রা তাঁর বিখ্যাত কিছু বাণী ও উপদেশ পড়ব যা আমাদের জীবনে সাহস ও সাফল্যের সাথে এগিয়ে যেতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

আসুন তাহলে দেখে নেওয়া যাক চাণক্য নীতি কথা বা বাণী সমূহ ও তার বিস্তারিত অর্থ:

১) রাতের ভূষণ চাঁদ, নারীর ভূষণ পতি, পৃথিবীর ভূষণ রাজা, কিন্তু বিদ‍্যা সবার ভূষণ

চাণক্য

মানুষ যদি কিছু নিজের মধ্যে ধারণ ক‍রতে পারে তা হল বিদ‍্যা অর্থাৎ জ্ঞান যা কখনোই মানুষের থেকে কেড়ে নিতে কেউ পারেন না। চাণক্য নীতি কথা তাই যথার্থ বলেছে রাতের আকাশে চাঁদ যেমন শোভা পায় তার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে সম্মান করলে, স্বামী যেমন স্ত্রীর ভূষণ হয়ে ওঠে, প্রকৃত নিষ্ঠাবান রাজা তেমন দেশের ভূষণ । এই গুলি যাদের না জোটে সেই ব‍্যক্তি অনেক ভাবে অপদস্থ হয়। কিন্তু বিদ‍্যা হল এমন একটি জিনিস যা প্রতিটি ব‍্যক্তি নিজের ভূষণ করে তুলতে পারে তার জন্য কারো ওপর তাকে নির্ভর হয়ে থাকতে হবে না। নিজের ইচ্ছা , জানার আগ্রহ , শেখার ক্ষমতা ব‍্যক্তিকে বিদ‍্যার দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করবে। ধীরে ধীরে বিদ‍্যাই হয়ে উঠে ব‍্যক্তির ভূষণ, প্রকৃত শক্তি ও অস্ত্র।

২) “সত্যনিষ্ঠ লোকের অপ্রাপ‍্য কিছুই নাই”

চাণক্য

মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ভালো যেমন আছে তেমনি খারাপ আছে। সততা, নিষ্ঠা, কর্তব্য পরায়ণতা, সাহসী এইসবের পাশাপাশি লোভ, লালসা, দম্ভ, অহংকার, চাতুরতা প্রভৃতি সমানভাবে স্থান পায়। যে ব‍্যক্তি সত‍্যের পথ অবলম্বন করে , নিষ্ঠা সহকারে সমস্ত কার্য পরিচালনা করে , কোনো পরিস্থিতিতে সত্য থেকে পিছপা হয়না সেই ব‍্যক্তির নিকট পৃথিবীতে অসাধ‍্য এবং অপ্রাপ্ত কিছুই হতে পারে না। পৃথিবীতে সত্যের থেকে বড়ো প্রাপ্তি আর কিছুতে নেই। তাই যে ব‍্যক্তির সাথে সত্য, নিষ্ঠা পরিপূরক ভাবে আছে সেই ব‍্যক্তিকে সবথেকে প্রাপ‍ক বলে গন‍্য করা হয়।

৩) “যারা রূপযৌবনসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হয়েও বিদ‍্যাহীন, তাঁরা সুবাসহীন পলাশফুলের মতো বেমানান”

চাণক্য

ফুল মানুষ শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য না সুগন্ধির জন্য ব‍্যবহার করে। এই সুগন্ধ অনুপস্থিত থাকলে ফুল বেমানান লাগে। সুগন্ধ সৌন্দর্য ঢাকতে পারে কিন্তু সৌন্দর্য সুগন্ধ ঢাকতে পারে না। তখন ফুলটির উপস্থিতিতি শুধুমাত্র অস্তিত্ব জানান দেয় কোনো কাজের হয়না যেমন পলাশ ফুল – সুন্দর হলেও ভগবানের পায়ে তা স্থান পায় না। চাণক্য নীতি তেমন রূপবান ও রূপবতী ব‍্যক্তিদের বিদ‍্যা ছাড়া অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। রূপ বিদ‍্যা, শিক্ষাকে ঢাকতে পারে না কিন্তু রূপের পাশাপাশি বিদ‍্যা সেই ব‍্যক্তিকে সম্পূর্ন করে তোলে।শুধু রূপের সৌন্দর্য দিয়ে কিছু বাস্তবে হয়না তাই তা পলাশ ফুলের মতো হয়ে যায়। কিন্তু অল্প রূপবান অধীক বিদ‍্যা থাকলে ভগবানের পায়ে স্থান পাবার মতো ওই ব‍্যক্তি উচ্চ স্থানে স্থান পায়।

৪) “উৎসবে, বিপদে, দূর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম কালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে, যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু”

চাণক্য

আম‍রা বড়োদের কাছে শুনি এবং নিজেরাও জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখি ভালো সময়ে কত মানুষ আমাদের পাশে থাকে কিন্তু হঠাৎ করেই চরম দূর্ভোগের সময়ে সেই সংখ্যাটা কমে যায়।যারা থাকে মুখ পরিচিত থাকলেও সংখ্যা খুবই কম। আর যারা থাকে তারা ভালো কি মন্দ সবেতেই উপস্থিত থাকে। সবটুকু ভাগ করে নিতে যারা প্রস্তুত তারাই প্রকৃত অর্থে বন্ধু। চাণক্য নীতি তাই উপরিউক্ত স্থান উল্লেখ করে আমাদের বুঝিয়েছে যে উৎসব থেকে শবদেহ যাত্রা আবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজদ্বার এই সকল স্থানে পাশে দাঁড়ানো ব‍্যক্তি প্রকৃত বন্ধু। ভালো সময় আসতে না পারলেও খারাপ সময় ঠিক ছুটে আসবেই।

৫)”অহংকারের মতো শত্রু নেই”

চাণক্য

মানুষ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে বিবেচিত হয়। তার মতো মান আর হূষ কোনো জীবের নেই এই পৃথীবিতে। কারণ, তার বিবেচনা করার ক্ষমতা আছে। তেমনি মানুষ আবার সবথেকে ভয়ংকর হয়ে যেতে পারে যদি তার বিবেক বুদ্ধি সঠিক ভাবে পরিচালনা না করে। এমত অবস্থায় মানুষের অহং বোধ জেগে ওঠে যা মানুষকে সর্বসম্মত ভাবে বুদ্ধি বিবেচনা হীন করে তোলে। অজান্তেই মানুষ এমন অনেক কাজ করে ফেলে যা চিন্তার অতীত। মানুষ ঠিক ভুল বুঝতে পারে না। তখন অনেক নিজের কিছু সে হারিয়ে ফেলে। ফলত যখন অহংকার কাটিয়ে উঠে নিজের ভুল বুঝতে পারে তখন তার কাছে না থাকে ভুল শুধরানোর উপায় আর না থাকে নিজের কাছের জিনিস ফিরে পাওয়ার রাস্তা। এই বক্তব্যটি চাণক্য নীতি কথা তে যথাযথ ফুটে উঠেছে যে অহংকার মানুষের সবথেকে বড়ো শত্রু।

৬) “পুত্র যদি হয় গুণবান, পিতা মাতার কাছে তা স্বর্গ সমান”

চাণক্য

সন্তান হল সব পিতা মাতার কাছে ভগবানের দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। পিতা মাতা তার সবটুকু দিয়ে সেই সন্তানকে বড়ো করার চেষ্টা করেন। নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেয়। সব ত‍্যাগ করতে পারে সন্তানের শুভকামনায়। আর সারা জীবনের এই প্রচেষ্টা সফল হয় যখন তার সন্তান প্রকৃত গুণে গুণী হয়ে ওঠে। হিন্দু মতে, কোনো ব‍্যক্তি পূর্ণ করলে মৃত্যুর পর স্বর্গ সুখ পাওয়া আবশ্যিক। একজন গুণী সন্তান তার মাতা পিতাকে এই এক সুখ দিতে পারে জীবত থাকা কালেই। গুণীর গুণে পিতামাতার গর্বিত বোধ করে। যা কোনো স্বর্গ সুখের থেকে কম কিছু নয়। চাণক্য নীতি এই কথাটিই স্পষ্ট ব‍্যক্ত করেছেন যে গুণী সন্তান মাতাপিতার আসল অলংকার যা পৃথিবীর সমস্ত অলংকারকে হার মানায় এবং এই সুখ পৃথিবীর কোন পার্থিব জিনিস দিতে পারবে না।

৭) “একটি দোষ বহু গুণকেও গ্রাস করে”

চাণক্য

কথাতেই আছে খারাপ কোনো কিছু হলে তা হাওয়ার থেকেও বেশি গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো গুণী ব‍্যক্তি যদি সর্ব গুণ থাকা সত্ত্বেও তার মধ্যে খুঁত থাকে তাহলে সেটাই সবার দৃষ্টি গোচ‍র হয়ে থাকে। এবং সেই একটি দোষ ব‍্যক্তির কলঙ্ক হিসাবে সারা জীবন থেকে যায়। যার থেকে চাইলেও নিস্কৃতি মেলেনা সহজে। যত ভালো কাজই করুক না কেন, সেই দোষ তার সম্মুখে এসে হাজির হবে যেকোনো ভাবে, তা কোনো আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমেই হক বা কথা কথায়ই হক, আজীবন ব‍্যক্তিকে হিনমন্নতায় ভুগতে বাধ্য করে তার অন্ত‍র আত্মা বা আত্মীয় পরিজন। তাই চাণক্য তাঁর নীতি কথা দ্বারা প্রকাশ করেছেন যে মানুষের একটি দোষ তার সর্ব গুণ ঢেকে দিতে যথেষ্ট।

আরও পড়ুন – জীবন নিয়ে উক্তি(Quotes About Life): সফল জীবনের চাবিকাঠি

চাণক্য যার অপর নাম কৌটিল‍্য আমরা আগেই উল্লেখ করেছি এছাড়াও বিষ্ণুগুপ্ত নামেও তিনি পরিচিত। ইটালির বিখ্যাত কূটনীতিবিদ নিকালো মেকিয়াভেলি-র কূটনৈতিক পারদর্শীতা ভেবে চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয় যদিও তিনি নিকালো মেকিয়াভেলির বহু বছর আগে তাঁর নীতি স্থাপন করে গেছেন। চাণক্য নীতি- যা শত পরিস্থিতি এবং সময়ের পরিবর্তন এলেও এই চাণক্য বাণী সর্বান্তকরণে সত্য থেকে যাবে আজ এবং ভবিষ্যতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি সমাজের বিদ‍্যার নানা শাখা এই বিংশ শতাব্দীতে দাড়িয়ে চাণক্য নীতি শিক্ষার্থীদের শেখায় যা জীবনকে সঠিক ভাবে ভাবতে,দেখতে আর পরিচালনা করার দীক্ষায় দীক্ষিত করে তোলে।

আলোচনাটি আশা করি ভালো লাগবে। ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন পোষ্টটি আপনার বন্ধুদের সাথে। আগামী দিনে এভাবেই পাশে পাব আপনাদের এই কামনা করি।
ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Top